করোনায় কাজ করে মুখ উজ্জ্বল সরকারি কর্মীদের

Feature Image

মাঠ থেকে কেন্দ্র। সরকারি কাজ নিয়ে এত দিন অভিযোগের শেষ ছিল না। কিন্তু করোনার এই সময় মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। করোনা শুরুর পর থেকে সাধারণ মানুষের দুয়ারে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জোরালো চেষ্টা জনপ্রশাসনের মুখ উজ্জ্বল করেছে। সামনের দিনে সেই ধারাবাহিকতা রাখাই এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্টরা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, অন্য কাজেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা থাকবে।

করোনাকাল শুরুর আগে জামালপুর ও কুড়িগ্রামের ডিসিদের নেতিবাচক কার্যক্রমে মাঠ প্রশাসন নিয়ে সারা দেশেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল। করোনার কারণে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর ত্রাণ কার্যক্রম ও জনগণকে ঘরে রাখার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নেয় মাঠ প্রশাসন, যা সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়ায়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও ডিসি-ইউএনওদের মাধ্যমে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যে কারণে ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপমুক্ত করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন পরিচালনায় দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছেন, স্থানীয় ত্রাণ বিতরণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একটি বড় সমস্যা। এ কারণে শুধু প্রশাসনিক চ্যানেলে ইউনিয়ন পরিষদে ত্রাণ যাওয়ায় বণ্টন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। এর ফলে মাঠ প্রশাসনের প্রশংসা হচ্ছে বেশি।’

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার এই সময় মাঠ প্রশাসনের অক্লান্ত পরিশ্রম উল্লেখ করার মতো। করোনাকাল শেষ হওয়ার পর মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে আলাদাভাবে মূল্যায়ন হবে। যাদের উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছে তাদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে।

মাঠ প্রশাসনে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় পুলিশের। কিন্তু এই সময় সরকারি চাকুরেদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুতে পুলিশের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সার্বক্ষণিক মাঠে থাকার ফোর্স হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছে পুলিশ। এই ধারা অব্যাহত রাখতে চাচ্ছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গত ৪ জুলাই পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘একদিন করোনা চলে যাবে; এরপর কী হবে। আমরা কি আবারও আমাদের

আগের স্বরূপে আবির্ভূত হব?’ তিনি বলেন, ‘টাকা দিয়ে মানুষের সম্মান পাওয়া যায় না। গত তিন মাসে আমরা যে সম্মান পেয়েছি, স্বাধীনতার পরে আর এত মর্যাদা কখনো পুলিশ পায়নি।’

মাঠ প্রশাসনের মূল নেতৃত্ব দেন ডিসি-ইউএনওরা। নওগাঁর ডিসি হারুন-অর-রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারছি সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছে বেশি কিছু চায় না। তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় সেবাটা ঠিকভাবে পেতে চায়, আর একটু ভালো আচরণ প্রত্যাশা করে।’ নিজের প্রশাসনিক এলাকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘এখানকার মানুষ খুবই ভালো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসনের দিকনির্দেশনাকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন।’

যশোরের ডিসি তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘করোনার সময় মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব পালন খুব চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো কঠিন কাজ। সচেতনতার অভাবের কারণে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় বেগ পোহাতে হচ্ছে। তবে মানুষকে বোঝালে কথা শুনছে, সবার সহযোগিতা পাচ্ছি।’

করোনার কারণে বৃদ্ধদের প্রতি অমানবিক আচরণ, আক্রান্ত হয়ে মৃতদের দাফন-কাফনে স্বজনদের অবহেলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে মাঠ প্রশাসনের উদ্যোগের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড।

করোনাকালের শুরুতে সিনিয়র সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালনের পর সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন শীতেষ চন্দ্র সরকার। অল্প সময়ে নানামুখী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সাড়া ফেলেছেন তাঁর প্রশাসনিক এলাকায়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করার চেষ্টা করছি। আমি নিজেও গ্রামের ছেলে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাগুলোতে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করি।’ শীতেষ বলেন, ‘আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রশাসনের ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের নির্দেশ রয়েছে। আমরা সেভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি।’

মাঠ প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে আছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ। এই অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল গাফ্ফার খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করে করোনা সংকট সামলাচ্ছেন। সত্যিই এটা প্রশংসার যোগ্য।’ তিনি বলেন, করোনাকালের পরে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমেও যাতে এই ধারা অব্যাহত থাকে সেই চেষ্টা থাকবে।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রশাসনের প্রায় পৌনে ৩০০ কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অর্ধেকের মতো সুস্থ হয়েছেন। মারা গেছেন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে গত ২৯ জুন মারা গেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী। আর প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে গত মঙ্গলবার মারা গেছেন লেজিসলেটিভ বিভাগের সচিব নরেন দাস।

আরো খবর »