বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে শহরেও

Feature Image

দেশের উত্তরের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এবার ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কোনো কোনো জেলা-উপজেলায় নিম্নাঞ্চল ছাপিয়ে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে শহরাঞ্চলেও। করোনার এই কালবেলায় দীর্ঘমেয়াদি বন্যা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ত্রাণের পরিমাণ অপ্রতুল বলে জানাচ্ছে দুর্গত মানুষ। সব মিলিয়ে বানভাসিরা চরম সংকটে দিন পার করছে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দি মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুর বাসস্থান ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকে তাদের গবাদি পশু নিয়ে উঁচু সড়ক ও সেতুতে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে অসহায় জীবন যাপন করছে। দিনভর ত্রাণের আশায় তাকিয়ে থাকলেও তা অনেকের ভাগ্যেই মিলছে না। কিছু এলাকায় দেখা দিয়েছে পানীয় জলের সংকট।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে কিছুটা উন্নতি হয়েছে পূর্বাঞ্চলে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

পূর্বাভাসে আরো বলা হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকা জেলার আশপাশের নদীগুলোর পানি বাড়ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

বর্তমানে পর্যবেক্ষণাধীন ১০১টি পানি স্টেশনের মধ্যে বাড়ছে ৪৯টির, কমছে ৪৯টির এবং স্থিতিশীল রয়েছে তিনটির। বন্যায় আক্রান্ত জেলা ২০টি। বিপত্সীমার ওপর দিয়ে ১৯টি নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর বিপত্সীমার ওপরে পানি প্রবাহিত হওয়া স্টেশনের সংখ্যা ৩০। তবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমেছে।

চাঁদপুরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্গতির শেষ নেই। ভাঙনের শিকার হয়ে নদীতে সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। জেলার হাইমচরে মেঘনা নদীর পশ্চিমে মিয়ারচর এলাকায় বিপর্যস্ত হয়ে কয়েক শ পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। জেলা সদরের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের পাঁচটি চরে পদ্মা নদীর ভাঙন চলছে। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মাত্র ২৬ পরিবারের জন্য ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

শরীয়তপুরে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৬ট থেকেই সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার নড়িয়া, জাজিরা, ভেদরগঞ্জ ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৪০টি ইউনিয়নে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার চার হাজার ৩১৮টি পরিবার। শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্থানে সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় কয়েক শ মাছের ঘের, পানের বরজ ও ফসলি জমি। প্রবল স্রোতের মুখে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না ফেরি। পাশাপাশি গাড়ির চাপ বেড়ে ফেরি পারের অপেক্ষায় আটকা পড়ে আছে শত শত গাড়ি। এতে চার কিলোমিটার রাস্তায় ট্রাকের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়েছে।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বিপত্সীমার বেশ ওপর দিয়ে বইছে। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢল এই পানি বৃদ্ধির কারণ। সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা এলাকার প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নতুন করে গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

গত কয়েক দিন কমলেও রাজবাড়ীতে পুনরায় পদ্মা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিপত্সীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের এলাকাগুলো নিমজ্জিত হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরের পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিপত্সীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার সাত উপজেলায় ৫৪১টি গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার ১১টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে সাত হাজার মানুষ তাদের গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্লাবিত এলাকায় বিভিন্ন উঁচু সড়ক ও বেড়িবাঁধে আরো কয়েক হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকেলে ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৮৪ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপত্সীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলার ৫৬টি ইউনিয়নের ছয় শতাধিক গ্রামের প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্যার কবলে পড়া মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, গবাদি পশু খাদ্য সংকট এবং তাদের স্যানিটেশন সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।

মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর পানি বাড়ায় সদর উপজেলাসহ মানিকগঞ্জ পৌরসভাও বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে পৌরসভার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার গঙ্গাধরপট্টি, শিববাড়ী, পশ্চিম সেওতার একাংশ, মানরা এলাকার বেশ কিছু রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটুপানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঢুকে পড়েছে ঘরবাড়িতেও। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরো বেশ কিছু এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরো খবর »