ঐতিহাসিক ইস্যুগুলো এড়িয়ে এগোনো কঠিন

Feature Image

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে সাড়া দিচ্ছে না পাকিস্তান। সেই যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, সম্পদের বণ্টন, চিহ্নিত ১৯৩ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মতো ঐতিহাসিক ইস্যুগুলোও পাকিস্তান এড়িয়ে চলছে। এসব অমীমাংসিত বিষয় পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার পথে বড় বাধা বলে মনে করেন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে পাকিস্তানের কাছে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ বাংলাদেশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে ও মানুষে মানুষে যোগাযোগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ঐতিহাসিক ইস্যুগুলো নিষ্পত্তি ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক তৈরি হওয়া বেশ কঠিন। ইমরান খান কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুললেও এ ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট এবং ভারত বিষয়টি অবগত। তাই এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন বা সম্পর্কের অবনতি বা নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ইমরান খানের ফোনালাপ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, “তিনি (পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) কভিড-১৯, বন্যা নিয়ে কথা বলেছেন। এটা ছিল ‘সিম্পল কার্টেসি কল’ (সাধারণ শিষ্টাচারমূলক ফোন)। সম্পর্ক যদি তারা ভালো করতে পারে, সেটা ভালো। একটি জিনিস তো তারা এখনো করেনি, তারা গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়নি। ক্ষমা না চাইলে সম্পর্ক গভীর হবে কিভাবে? আমরা তো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই।”

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনো খুব ভালো ছিল না। তার ওপর আমরা যখন আমাদের নিজস্ব আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছিলাম, তখন তারা সেটা নিয়ে নিজেদের সংসদে পর্যন্ত অযাচিত মন্তব্য করল। যে কারণে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক আরো খারাপ হয়।’ তিনি বলেন, ‘যে কার্যকলাপের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে সেটা তাদের নির্বুদ্ধিতা ছিল। সেটা কাটিয়ে উঠে পাকিস্তান এখন নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে চাইছে। ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায় পাকিস্তান। এটা স্বাভাবিক।’

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন এটি খুবই স্বাভাবিক। কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, বাণিজ্য আছে, লোকজন আসা-যাওয়া করছে, এখানে তো আমি কোনো আপত্তি দেখি না। আমরাও কথা বলি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও সবার সঙ্গে কথা বলেন। এটি স্বাভাবিক চর্চা।’ তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তো সহযোগিতা চাইবেই। তারা ৭০-৭২ বছর ধরে চেষ্টা করছে। তারা তো অনেকের কাছেই সহযোগিতা চাচ্ছে। বাংলাদেশের কাছেও চাচ্ছে। বাংলাদেশ কী সহযোগিতা করতে পারে তা বাংলাদেশ বুঝবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘উপমহাদেশের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকা দরকার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর একটি উদ্যোগের কথা বলেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তা শুনেছেন। আমি এটাতে খুব বেশি কিছু হিসাব করব না। আমি বলব যে এটা স্বাভাবিক শিষ্টাচারের অংশ। তাঁরা কথা বলতে চেয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। এতটুকুই বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি একে কূটনৈতিক বিচারে সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে মনে করি। আমি এর খুব বেশি ভেতরে যেতে চাই না। তার কারণ হলো, একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান কথা বললে স্বাভাবিকভাবেই আমন্ত্রণের বিষয়টি আসে। এটি ভদ্রতা, শিষ্টাচারের ব্যাপার।’

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার কোনো প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে কি না—জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, তিনি তা মনে করেন না। ভারতের হাইকমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তিনি যেদিন বলেছেন, সেদিনই ২০১০ সালে বাংলাদেশের অঙ্গীকার করা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পূর্বাঞ্চলে পণ্য নেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতি, বিকাশ অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেমন দ্বিপক্ষীয় থাকা উচিত, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও দ্বিপক্ষীয় থাকা উচিত। এখানে তৃতীয় পক্ষের পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় থাকা উচিত নয়।’

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে বাধাগুলো বিষয়ে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অনেক বিষয় আছে যেগুলো কখনো কখনো মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের জন্য অস্বস্তির কারণ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার সময় পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী যে ধরনের হত্যাযজ্ঞ এ দেশে চালিয়েছে, পাকিস্তান কিন্তু এখনো তার দায় স্বীকার করে না। বিভিন্ন বিষয়ে পাকিস্তান অতিকথনের দিকে চলে যায়। যখনই যায় তখন তা আমাদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।’

আরো খবর »