২০ বছর কেটে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি ইস্টার্ন বাইপাস

Feature Image

উজানের পানি আর মৌসুমি বৃষ্টিতে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বন্যায় তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে গড় বৃষ্টিপাত ক্রমে বাড়তে পারে—এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। গত সোম, মঙ্গল ও বুধবারের বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক ও অলিগলি। এখনো কোনো কোনো এলাকায় পানি জমে রয়েছে। কারণ ঢাকার পানি নর্দমা ও বক্স কালভার্ট হয়ে খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হতো নদীতে, যা এখন পারছে না। উজানের ঢলে মূল ঢাকার চেয়ে বেশি উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে আশপাশের নদীগুলোর পানি। ফলে স্লুইস গেট খুলে দেওয়ায় উল্টো ঢাকায় ঢুকছে নদীর পানি।

এ অবস্থায় রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও বন্যা ঠেকাতে ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক নির্মিত হলে পুরো পূর্ব ঢাকা বন্যা ও জলাবদ্ধতামুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কমবে মূল শহরের যানজট।

কিন্তু আলোচনা আর সভা-সেমিনারে ২০ বছর কেটে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। এখনো পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।

‘ঢাকা সার্কুলার রোড কাম ইস্টার্ন বাইপাস’ নামের প্রকল্পটির প্রকল্প প্রস্তাব আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ করছে পাউবো। এই প্রকল্পের আওতায় ২৪ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর ফলে প্রায় ১২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা উপকৃত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের বর্তমান অবকাঠামোতে প্রতিদিন মাত্র ৪০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি নিষ্কাশন করা যায়। কিন্তু গত তিন দিনে ১৮৩ মিলিমিটার বা গড়ে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর উচ্চতা বৃষ্টি পেয়েছে। ফলে স্লুইস গেট বন্ধ করে পাম্প চালু রেখেছে ঢাকা ওয়াসা। বাঁধ দিয়ে বালু ও তুরাগ নদের পানি ঠেকানো না গেলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করা কঠিন হয়ে যাবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার পশ্চিমে বাঁধ দেওয়ার ফলে ওই দিকে নদীর পানি প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু পূর্বাঞ্চলে এখনো তা দেওয়া যায়নি। একটি রাজধানীকে বন্যার কবল থেকে অবশ্যই রক্ষা করা উচিত। ফলে ইস্টার্ন বাইপাস কাম বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা সমাধানে খালগুলো উদ্ধার করে তা নদীর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’

পাউবো সূত্র মতে, প্রস্তাবিত ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক ও বাঁধটি টঙ্গী সেতুর আব্দুল্লাহপুর প্রান্ত থেকে তুরাগ নদের তীর ধরে শুরু হবে। কারণ এর পশ্চিম প্রান্ত থেকে ওয়েস্টার্ন বাইপাস সড়ক শুরু হয়েছে। আব্দুল্লাহপুর থেকে শুরু হয়ে বালু নদের পার ধরে ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক ও বাঁধটি মাদানী এভিনিউ হয়ে ডেমরায় শীতলক্ষ্যার সুলতানা কামাল সেতুতে গিয়ে শেষ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষায় নদীর পানি ঢাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। একই সঙ্গে নদীর পানির উচ্চতা বাড়লেও ঢাকার পানি তিনটি পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে সেচে নদীতে ফেলা হবে। ফলে ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান মিলবে। এ ছাড়া কমবে অসহনীয় যানজট। বাইরের যানবাহন মূল শহরে প্রবেশ না করেও বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যেতে পারবে। গতিশীল হবে ঢাকা নগর।

প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন মৌজায় জমির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রকল্প ব্যয় আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক পাউবোর প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম। জমির দাম প্রাক্কলন করতে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে ১৮ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে প্রকল্প এলাকার জমি অধিগ্রহণে ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন খাতে। ১৯৯৯ সালে যখন প্রকল্পটি নিয়ে প্রথম পরিকল্পনা করা হয়, তখন সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে অর্থায়নে দাতা সংস্থাগুলো আগ্রহ না দেখানোর কারণে সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা (জাইকা) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করেছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিকতা আর অর্থায়নের শর্তের জটিলতার কারণে ঋণ দেয়নি সংস্থাটি। ফলে অর্থায়নকারী সংস্থা চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রায় ২০ বছর পার হলেও এখনো প্রকল্পটির কাজ শুরু করা যায়নি।

২০১৮ সালের শেষ দিকে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান সরকার প্রকল্পটি নিয়ে আবারও কাজ শুরু করে। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর সামনে নতুন করে প্রকল্প ধারণা উপস্থাপন করে পাউবো। অর্থায়নকারী বৈদেশিক সংস্থা আগ্রহ না দেখানোয় সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফর্মা (ডিপিপি) তৈরি করেছে পাউবো।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মতিন সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে গোড়ান চাঁদবাড়ি স্লুইস গেট এলাকায় নদীর পানি ঢাকার চেয়ে ছয় ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। গেট খুলে দিলে পুরো এলাকা তলিয়ে যাবে। কিন্তু ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক ও বাঁধ সম্পন্ন হলে পুরো এলাকা বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ডিপিপি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে যাবে। এরপর তা একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) যাবে।’

আরো খবর »