হত্যার মতোই অপরাধ

Feature Image

ভুয়া রিপোর্ট থেকে ভুল চিকিৎসা হয় আর ভুল চিকিৎসায় থাকে মৃত্যুর ঝুঁকি। তাই করোনাসহ যেকোনো ভুয়া বা মিথ্যা রিপোর্ট মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। এই রকম একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে দেশে। পাশাপাশি নকল বা মানহীন সুরক্ষাসামগ্রীর মাধ্যমে চিকিৎসকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁদের মৃত্যু ঘটেছে তাঁদের অনেকেই নকল ও মানহীন মাস্কের কারণে সংক্রমিত হয়েছিলেন বলে দাবি তোলা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। এ জন্য ওই সব অপরাধীর কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পক্ষে দিনে দিনে সরব হচ্ছে অনেকেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ভুয়া রিপোর্ট এবং নকল ও নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি মানুষের প্রাণ নিয়ে অমানবিক ব্যবসায় মেতে উঠেছিল। রিজেন্ট হাসপাতালের মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম, জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী এবং একই প্রতিষ্ঠানের আহ্বায়ক ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী, অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের শারমিন জাহান শুধু প্রতারকই নন, তাঁরা মানুষ হত্যার মতো অপরাধ করেছেন বলেও মনে করছে দেশের মানুষ।

কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে যাঁরা মানুষকে মেরে ফেলে ব্যবসায় দ্বিধা করেননি বা করছেন না, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কেউ যেন না পান। কারণ রিজেন্ট হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেকেজি যে কাণ্ড ঘটিয়েছে তার চেয়ে নৃশংস আর কিছুই হতে পারে না। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের মধ্যে যে নকল মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে তা-ও একই অপরাধের শামিল।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘নকল, নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই ব্যবহারকারীদের মধ্যে যে চিকিৎসাকর্মীদের মৃত্যু হয়েছে তাঁদের বিষয়গুলো তদন্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে ওই নকল মাস্ক ও পিপিইর কারণেই চিকিৎসকদের কেউ বা অন্য কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছিলেন, তবে আমার মনে হয়, ওই সব সরবরাহকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তোলার সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে ভুল বা ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে নেগেটিভকে পজিটিভ আর পজিটিভকে নেগেটিভ করায় অনেকের চিকিৎসাও ভুল হওয়ার কথা। এ বিষয়ও তদন্তের দাবি রাখে।’

মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেছেন, রিজেন্টের সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত একের পর এক অভিনব প্রতারণার অভিযোগ এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে তাঁরই হাসপাতাল থেকে কভিড-১৯-এর ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় তাঁর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে যারা মারা গেছে, সেই সব ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে সাহেদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের পর তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও করা যায়। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তভাবে তদন্ত করতে হবে, যাতে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা যায়। তা না হলে দেখা যাবে, কৌশলে হত্যার অভিযোগ থেকে তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন। যেমনটি তিনি অভিনব কায়দায় প্রতারণা করেছেন। মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, সাহেদের প্রতিষ্ঠিত রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করেননি। এরই মধ্যে চিকিৎসা চালিয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই চিকিৎসা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে তদন্ত কর্মকর্তাদের। চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণ করা গেলে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা সহজ হবে। ইচ্ছাকৃত অবহেলার মামলা আদালতে প্রমাণ করা গেলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে; অন্যথায় প্রতারণার অভিযোগ বা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে বেশিদিন তাঁকে কারাগারে রাখা যাবে না।

নকল মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, ইচ্ছা করেই নকল সামগ্রী সরবরাহ করেছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের সরবরাহ করা এই নকল সামগ্রী কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী ব্যবহার করেছেন কি না, তাঁদের কেউ মারা গেছেন কি না, তা আগে জানতে হবে। কেউ মারা গেলে ওই সব সামগ্রী সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা যাবে। তবে এসব মামলা করতে হবে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত ও সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করতে হবে। সেভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। তবেই কেবল এসব প্রতারণাকারীকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনা যাবে।

গত ২৩ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারে অভিযান চালিয়ে নির্বাহী আরিফুলসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর করোনা চিকিৎসার নামে ভয়ংকর জালিয়াতির তথ্য পায় পুলিশ। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণা, জালিয়াতি, মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে চারটি মামলা দায়েরের পর আরিফুলের স্ত্রী ডা. সাবরিনার সংশ্লিষ্টতাও উদ্ঘাটিত হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, ১৫ হাজার ৪৬০ জনের ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে আরিফ-সাবরিনা সিন্ডিকেট। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, তদন্তে জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ৬ জুলাই উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে আরো ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য মেলে। সেখানে ছয় হাজার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার পাশাপাশি ভুয়া চিকিৎসার তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের বহুরূপী জালিয়াতির তথ্য মেলে। র‌্যাবের কাছে ১৬০ জন ভুক্তভোগী তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। ৭০টির বেশি মামলার তথ্য এবং ৪৮টি মামলার নথিপত্র হাতে পেয়েছে র‌্যাব। জালিয়াতি ও অস্ত্র আইনের মামলায় প্রতারক সাহেদের ৪৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিভিন্ন আদালত। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এর আগে রিজেন্ট হাসপাতালে দুই দফায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছিল। অপচিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় সাহেদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছিল। অন্য মামলার মতো এসবও ধামাচাপা দিয়ে চলছিলেন সাহেদ।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, গত দুই মাসে করোনা পরীক্ষা ও জালিয়াতির ঘটনায় ১৫ মামলায় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথম জালিয়াতি ধরা পরে গত ৪ জুন ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে। ডেনিটেক্স নামের একটি গার্মেন্টের শ্রমিকদের জালিয়াতির মাধ্যমে করোনার কয়েকটি নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ আবু সাঈদ ও রাজু নামের দুজনকে গেণ্ডা এলাকা থেকে আটক করে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল মাস্ক সরবরাহের কারণে গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার শারমিন জাহানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ১৯ জুলাই গুলশানে শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অনুমোদন ছাড়াই করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা, ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া, অনুমোদন ছাড়া র‌্যাপিড কিট ব্যবহার, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগে সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবুল হাসনাত এবং পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল আল ইসলামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব আসামি জিজ্ঞাসাবাদে টাকার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর কারবার চালানোর তথ্য দেন।

আরো খবর »