শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট ও অতিরিক্ত ভ্যাট প্রত্যাহার চান ৪৪ বিশিষ্ট নাগরিক

Feature Image

দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা এবং ইন্টারনেট বিলের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ভ্যাট মওকুফ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন দেশের ৪৪জন বিশিষ্ট নাগরিক।

শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সম্মিলিত বিবৃতিতে তারা একইসঙ্গে মোবাইল ফোনের কল রেটের ওপর মূল্য ছাড় দিয়ে প্রযুক্তি সেবা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুয়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহবান জানান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষে বিবৃতিটি পাঠান।

বিবৃতিতে বিশিষ্টজনেরা বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমাগত তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাও ক্রমশ তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট ছাড়া সব ধরনের শিক্ষার্থীর শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা কঠিন হবে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং নতুন প্রজনের মেধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকল্প নেই। ঠিক এসময় সরকার কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর/ভ্যাটের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

তারা বলেন, কোভিড-১৯-এর ঝুঁকির কারণে মার্চ-এর মাঝামাঝি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় যুক্ত রাখার জন্য সরকার কর্তৃক চালু করা দূর-শিক্ষণ কার্যক্রম, বিশেষ করে সংসদ টেলিভিশন যথাসাধ্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও রেডিওভিত্তিক শিক্ষা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার প্রয়াস প্রশংসার দাবি রাখে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং এটুআইসহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

বিবৃতিতে বলা হয়, তবে শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নের জন্য প্রযুক্তিকে অবশ্যই আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ট্যাবলেট ও ফোন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, এ শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিং-এর লক্ষে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, বিশেষ করে করে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য Massive online Open course (MOOC) চালু করা এখন সময়ের দাবি।

৪৪জন বিশিষ্ট নাগরিক বলেন, কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ইন্টারনেটের ওপর কর কমানোর পরিবর্তে বাড়ানো হয়েছে। প্রায় দুই ধাপে (ব্যান্ডউইথ পাইকারি কেনা এবং খুচবা বিক্রির জম্য) ১৫% হারে ভ্যাট আরোপ করার ফলে ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩২.২৫% অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী সংগঠনগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিক্ষার্থী আগে গড়ে ১ হাজার টাকা মাসিক ইন্টারনেট বিল দিতেন, একই সেবা নেয়ার জন্য এখন তাদেরকে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা গুনতে হবে। এটা অবশ্যই ডিজিটাল বাংলাদেশ এর লক্ষ্য অর্জনের পরিপন্থি।

তারা বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন পিছিয়ে যাবে। এমনকি এপর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব অর্জন হোঁচট খাওয়ার আশংকা বৃদ্ধি পাবে। তদুপরি ২০৪১ সালের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের কার্যক্রমগুলো গতি হারাতে পারে। সুবিধাভােগী এবং সুবিধা বঞ্চিতদের মধ্যে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আলামত এখনই দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের সংবিধান পরিপন্থি। মুজিববর্ষে এমনটি হওয়া কখনই কাম্য নয়।

তারা আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করবেন। তবে আমরা জানি নিরবচ্ছিন্নভাবে এই সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছুদিন সময় লাগতে পারে। তাই অন্তরবর্তীকালে ইন্টারনেট বিলের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ভ্যাট মওকুফ করে এবং মোবাইল ফোনের কল রেটের ওপর মূল্য ছাড় দিয়ে সরকার প্রযুক্তি সেবা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুয়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার পথ সুগম করবেন, এটা আমাদের জোর দাবি।

তারা আরও বলেন, আশা করছি আমাদের নীতি নির্ধারকরা এই দাবি পূরণের মাধ্যমে তাদের জনবান্ধব রাজনৈতিক অঙ্গিকারের প্রতিফলন ঘটাবেন।তাহলে আমরা নিশ্চয়ই এদেশের আপামর মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্মৃদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্ক, আলোকিত জাতি গঠনে এগিয়ে যেতে পারি।

বিবৃতিতে সই করা বিশিষ্টজনেরা হলেন-ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারাস উদ্দীন, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেন, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, রামেন্দু মজুমদার, শাইখ সিরাজ নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, রোকেয়া আফজাল রহমান. ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক মাহফুজা খানম, ফেরদৌসি মজুমদার, ইলিয়াস কান্চন, হাবিবুল বাশার সুমান, মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক এম এম আকাশ, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, শাহীন আনাম, ফারাহ কবীর, আসিফ সালেহ, ব্রিগেডিয়ার (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন, সঞ্জিব দ্রং, ইনাম আল হক, এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদারসহ মোট ৪৪জন।

আরো খবর »