দক্ষিণ সুদানে যেভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা

Feature Image

‘কুষ্ঠরোগী হিসাবে পরিবার এবং গ্রাম আমাদেরকে ত্যাগ করে। সবাই আমাদেরকে ভুলেই গিয়েছিল, আমাদের দুর্দশার অন্ত ছিল না। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে দেবদূতের মতো হাজির হলো।’

এ মন্তব্য দক্ষিণ সুদানের আগক কুষ্ঠরোগী নিরাময় কেন্দ্রের একজন নারী কুষ্ঠরোগী মাজেট ভিওলার। স্থানীয় নারীনেত্রী মিস আলেক্স ভিওলার মন্তব্য, ‘পরিবার-পরিজন রেখে একজন নারী কিভাবে সম্মুখসারিতে যুদ্ধরত থাকতে পারেন, সেটা আমার কাছে কল্পনার অতীত ছিল। বাংলাদেশি নারীদের সংস্পর্শে এসে আমি অভিভূত হয়েছি। দক্ষিণ সুদানের সামর্থ্যবান নারীদের আমরা সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য উদ্ধুদ্ধ করবো।’

সম্প্রতি দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ‘আনমিস’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের সম্পর্কে স্থানীয় নারীদের এই অভিমত তুলে ধরা হয়।

বিশ্বের যুদ্ধপীড়িত দেশগুলোতে শান্তি স্থাপনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান আগে থেকেই প্রশংসিত। এ কার্যক্রমে পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরাও গুরুত্বপূর্ণূ ভূমিকা রেখে চলেছেন এবং সম্প্রতি এতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে তাঁদের অধিকতর অংশগ্রহণে।

সেনা সদরের তথ্য অনুসারে বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশেরে অন্যান্য বাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীর ৬৮ জন নারী সদস্য কমর্রত আছেন। দক্ষিণ সুদানে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যের সংখ্যা ২৭ জন। এদের মধ্যে অফিসার-১১ জন এবং নারী সৈনিক-১৬। দক্ষিণ সুদানে গত বছরের ১০ অক্টোবর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সৈনিক শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেন।

জানা যায়, দক্ষিণ সুদানের বাহার-আল-গাজাল এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩ (ব্যানব্যাট-৩)-এর সাথে নিয়োজিত নারী শান্তিরক্ষীরা তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুদ্ধপীড়িত নারী ও শিশুদের সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের প্রশংসিত কর্মকাণ্ডের কথা আনমিস মিডিয়া যেমন- ওয়েবসাইট, ফেসবুক, বেতার এবং সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

দক্ষিণ সুদানে কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নারী শান্তিরক্ষীদের এ দলে রয়েছেন মেডিক্যাল অফিসার লে. কর্নেল মাসুমা তাসনিম, নারী শান্তিরক্ষীদের (ফিমেল অ্যানগেইজমেন্ট টিম) কমান্ডার মেজর আফরোজা এবং লজিস্টিক অফিসার মেজর তাজরিনসহ ১৬ জন নারী সৈনিক। দক্ষিণ সুদানে মোতায়েনের আগে ইউনিট এবং বিপসট (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিম সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং)-এ তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ সুদানে মিশন এলাকায় যাওয়ার পর থেকে তাঁরা শান্তিরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশন কার্যক্রমের পাশাপাশি যুদ্ধপীড়িত জনগণকে সহায়তাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। তাদের এই দক্ষতা ইতিমধ্যেই সেখানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত আনমিস সদর দপ্তর, সেক্টর সদর দপ্তর ও ফিল্ড অফিসসহ সবার মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণ বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদেরকে শুধুমাত্র সাদরেই গ্রহণ করেনি; বরং এই নারীদলের কার্যক্রমকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে তারা নিজেদের নারী জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছে। এ বছরের ২৯ মে তারিখে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রধান, এসআরএসজি (সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ অব দ্য সেক্রেটারি জেনারেল) মি. ডেভিড শেহরার দক্ষিণ সুদানের পশ্চিমাঞ্চলে সংঘর্ষ ও সংঘাত অবসানে ব্যানব্যাট ৩-এর সফলতা উল্লেখ করে নারী শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, নারী শান্তিরক্ষীরা যুদ্ধপীড়িত নারীদের সমস্যা অনুধাবন এবং সমাধানে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি বাংলাদেশসহ সব শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশকে আরো বেশি সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী পাঠানোর আহবান জানান।

শান্তিরক্ষীর নারী সৈনিকরা তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি সব দায়িত্ব যেমন- অস্থায়ী ক্যাম্প পরিচালনা, সীমানা নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা টহলসহ সব ধরনের অপারেশনাল কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা নবপ্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ সুদানের সব শ্রেণির জনগণের জীবনের প্রাণোচ্ছলতাকে ম্লান করে দিয়েছিল। তাঁরা বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের কাছে পেয়ে প্রাণখুলে তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ করছেন, যা সম্ভবত পুরুষ শান্তিরক্ষীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতো। নারী শান্তিরক্ষীরা আগ্রহভরে তাঁদের সমস্যাগুলো শুনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হন। এ রকম উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন এলাকায় অসুস্থদের চিকিৎসা দেওয়া, পশুপালকদের তাদের গবাদি পশুর চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দেওয়া এবং খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ।

বাংলাদেশি নারি শান্তিরক্ষীদের স্থানীয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আগক কুষ্ঠরোগী নিরাময় কেন্দ্রের অবহেলিত রোগীদের সহায়তার জন্য গত ২৪ ডিসেম্বর ক্রিসমাস উদযাপন এবং মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা সহায়তার আয়োজন করে। ব্যানব্যাট-৩ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের সাথে ওই কেন্দ্রের রোগীরা নেচে-গেয়ে দিনটি আনন্দের সাথে উদযাপন করেন। বাংলাদেশি নারী সেনা সদস্যরা রোগীদের খোঁজখবর এবং মতবিনিময়ের পাশাপাশি চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে মৃতপ্রায় কেন্দ্রটিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারে সক্ষম হন।

মাজক নামক স্থানে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের সহায়তায় নারী পশুপালকরা যেভাবে উপকৃত হয়েছেন, তা ক্যাথলিক রেডিও নেটওয়ার্ক (CRN)-এর এক সংবাদে উঠে আসে। এতে একজন স্থানীয় নারী পশুপালককে উদ্ধৃত করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এত দিন জানতাম না কেন আমাদের অসংখ্য গবাদি পশু মারা যায়। আজ আমাদের চক্ষু উন্মোচিত হয়েছে, আমরা ব্যানব্যাটের নারীদের কাছ থেকে যে ওষুধ এবং পরামর্শ পেয়েছি, সেগুলো আমাদের জন্য অবশ্যই সহায়ক হবে।’

নারীদের সমতা নিয়ে আন্দোলনরত স্থানীয় নারীনেত্রীরা বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ। ওয়াও আইনসভার ডেপুটি স্পিকার ও স্থানীয় নারীনেত্রী মিস আলেক্স ভিওলার নেতৃত্বাধীন নারীসংগঠনগুলো বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদলের সাথে মতবিনিময়সভাসহ বিভিন্ন সহযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা বাংলাদেশি নারীদের সৈনিক পেশার মতো এমন কঠিন পেশায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষিণ সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দায়িত্ব পালনে অর্জিত সফলতা দেখে অনুপ্রাণিত। তারা স্থানীয় নারীদের বাংলাদেশি নারীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা আনার নৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের ক্রমবর্ধমান হারে সম্পৃক্ত করার জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩-এর সাথে নিয়োজিত নারী শান্তিরক্ষীগণের কর্মতৎপরতা। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্রমোন্নতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও সর্বক্ষেত্রে নারীদের অধিকতর অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ সুদানের যুদ্ধক্লান্ত ও বিপর্যস্ত সমাজে যেখানে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা তাদের জন্য আশির্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের সমন্বিত কর্মদক্ষতা দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক কৌশল নির্ধারণসহ ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের সমস্যা সমাধানের উপায় নির্ধারণে একটি সেতুবন্ধ রচনায় সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ সুদানের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ তাঁর সাম্প্রতিক সফরে বিষয়টি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন এবং বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের প্রদর্শিত দক্ষতা এবং অর্জিত সুনামের প্রশংসা করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আনমিস-এর এসআরএসজি, ফোর্স কমান্ডার এবং ডেপুটি ফোর্স কমান্ডারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের কার্যকর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

আরো খবর »