৬২ প্রতিষ্ঠানের ৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

Feature Image

নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব পরিশোধ না করলে ৬২ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। ছয় মাস ধরে তদন্ত শেষে এই ৬২ প্রতিষ্ঠানের ৭৮ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। রাজস্ব পরিশোধে এসব প্রতিষ্ঠানকে আজ রবিবার থেকে চিঠি পাঠানো হবে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে এনবিআরে পাঠানো প্রতিবেদনে রাজস্ব ফাঁকির এ বিষয়টি জানা যায়।

পাওনা রাজস্ব আদায়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হচ্ছে, চিঠি পাওয়ার ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে পাওনা রাজস্ব পরিশোধ না করলে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হবে। মামলা এবং ব্যবসা চিহ্নিতকরণ নম্বর (বিআইএন) স্থগিত করা হবে।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার শওকত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিস্তারিত তদন্ত শেষে ৬২ প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের দেওয়া সব সুবিধা নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। পাওনা রাজস্ব পরিশোধে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে চিঠি পাঠানো হবে। এর পরও পরিশোধ না করলে ৬২ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করাসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজস্ব ফাঁকিবাজদের ছাড় দেওয়া হবে না।’

তদন্ত প্রতিবেদনে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ৬২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে—কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের লাকীরচর এলাকার ওয়েব ডেনাটস লিমিটেড দুই কোটি আট লাখ এক হাজার ৪৫৯ টাকা, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কনটেইনার রোডের হাসনাবাদ এলাকার রেডিয়েন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, চকবাজার পূর্ব ইসলামবাগের ৪৭/ক ঠিকানার বে পাল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৬৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৮০ টাকা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আজাদ রিফাত ফাইবাস লিমিটেড ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩৯ টাকা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এনায়েতপুরের শাসনগঞ্জ এলাকার এশিয়ান ফেব্রিকস মিলস লিমিটেড ৬২ কোটি ৬৪ লাখ ৮৪২ টাকা, সাভার এলাকার পৌসি লিমিটেড দুই কোটি ৭৮ লাখ টাকা, গাজীপুরের শ্রীপুরের গিলারচালা কেওড়া এলাকার প্লট নম্বর ২০২৩-এর হাউ আর ইউ টেক্সটাইল লিমিটেড এক কোটি ৮২ লাখ ২৬ হাজার ১৬ টাকা, গাজীপুরের শ্রীপুরের দক্ষিণ ভাংনাহাটির হামস গামেন্টস লিমিটেড এক কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ২৭ টাকা, সাভারের আশুলিয়ার ইপিজেড রোডের নেবুলা টাওয়ারের মেসার্স এ এস গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্স লিমিটেড ৪০ লাখ ৬৭ হাজার ৯২৬ টাকা, গাজীপুর সদর গাজীপুরের ভবানীপুরের রয়াপাড়া এলাকার মনিপুরের মেসার্স কেমিকন লিমিটেড ৮২ লাখ ২৪ হাজার ৬০৩ টাকা, গাজীপুরের মির্জাপুরের অনন্ত ক্যাজুয়াল ওয়্যার লিমিটেডের এক কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৬ টাকা, গাজীপুর মির্জাপুরের এলিগ্যান্ট এক্সেসরিজ লিমিটেড ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৩১৮ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ৬২টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানকে কারখানায় ব্যবহারের জন্য বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দিয়েছে সরকার। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এই ৬২ প্রতিষ্ঠানের পণ্য বন্দরে পৌঁছার পর দ্রুত পণ্য জাহাজে ওঠানো ও খালাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকে এলসি খুলতেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধা নিয়েও বছরের পর বছর আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তারা।

তদন্তে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কী পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হবে, এর জন্য কী পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন, ৬২ প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। বেশি দামের বেশি পরিমাণ পণ্য এনে উৎপাদনে ব্যবহার না করে গোপনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। অন্যদিকে একই পণ্য দেশি শিল্পের একাধিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে সব শুল্ক কর পরিশোধ করে নিয়ম মেনে বিক্রি করেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনোভাবে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না দেশীয় শিল্প-কারখানাগুলো। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা তথ্যে বিদেশ থেকে পণ্য আনে দেশে এ ধরনের একাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। এসব সিন্ডিকেট রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্য এনে গোপনে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকিবাজ অসাধু ব্যক্তিরা দেশের শত্রু। এসব অসাধু প্রতিষ্ঠানকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এদের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের সৎ ব্যবসায়ীরা।’

আরো খবর »