করোনা মোকাবেলায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে নৌবাহিনী

Feature Image

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশের ছয়টি জেলার ১৯ উপজেলা, সমুদ্র ও উপকূলীয় দ্বীপ এবং প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়োজিত নৌবাহিনী কন্টিনজেন্টসমূহ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একাজে পালাক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন এ বাহিনীর হাজার সদস্য। তাঁরা এলাকাগুলোতে নিয়মিত জীবাণুনাশক ওষুধ ছিটানো, প্রত্যন্ত এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় অসহায়, গরিব ও দুঃস্থদের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়াসহ জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রেখেছেন।

নৌবাহিনী জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ মালদ্বীপ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পৌঁছে দিয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সামগ্রী। একই সাথে করোনা মহামারির মধ্যে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ‘আমপান’-এর মত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে নৌবাহিনী। বর্তমানে বন্যা দুর্গতদের মাঝে নিয়মিত ত্রাণ বিতরণও অব্যাহত রেখেছে।

নৌ সদরের তথ্য অনুসারে নৌবাহিনীর কর্মরত সদস্যদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৭৭৫ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অবসর প্রাপ্তদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬ জন এবং এঁদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের।

নৌ সদর জানায়, করোনা প্রাদুর্ভাব রোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় গত ২৪ মার্চ থেকে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এর আওতায় উপকূল অঞ্চলে নিয়োজিত হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নৌবাহিনী।

নৌ কন্টিনজেন্টসমূহ চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চলের মানুষদের মাঝে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সন্দেহভাজন ও সংক্রমিতদের হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশানে থাকা নিশ্চিতকরণ এবং এর সাথে সাথে মাইকিং এর মাধ্যমে নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহারসহ বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া, দুঃস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিরলসভাবে পরিচালনা করছে।

চরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৌসদস্যরা স্থানীয় অসহায় ও দুঃস্থ জেলে পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তাঘাট, ফুটপাথ ও আশেপাশের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে জীবাণুনাশক ছিটানো, এলাকাবাসীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে নৌসদস্যগণ।

করোনা মোকাবেলায় নৌবাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত রেশন থেকে অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সাথে সাথে নৌবাহিনীর সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একদিনের বেতন চার কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়েছে।

নৌবাহিনীর নিজস্ব তহবিল থেকে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রি হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ পাঁচটি হাসপাতাল এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর সিএমএইচ-এ পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, বিশেষ নিরাপত্তা চশমা, থার্মো মিটারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা, খুলনা ও বরিশালের হতদরিদ্র ও দুঃস্থদের নিজস্ব তহবিল এবং নৌসদস্যদের ব্যক্তিগত অনুদান থেকে প্রায় প্রতিদিনই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই তহবিল ও অনুদান থেকে ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলসমূহে প্রায় ৬৭ হাজার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা ও নয় হাজারের বেশি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, এ সংকটকালে নিজ দেশে দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপেও নৌবাহিনী বাড়িয়ে দিয়েছে সৌহার্দ্যের হাত। নৌবাহিনী জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ মালদ্বীপ প্রবাসী বাঙালীদের জন্য পৌঁছে দিয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সামগ্রী। এর মাঝে রয়েছে ২০ হাজার পিস পিপিই, পাঁচ হাজার পিস হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ৯৬০ পিস নিরাপত্তা চশমা, ৪০ কার্টুন জরুরি ঔষধ ও প্রায় ৮৫ টন খাদ্য সামগ্রী।

এছাড়া নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলাার ও নৌকাগুলোকে মাইকিং এর মাধ্যমে সতর্ক করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। মহামারির এই বিপদসংকুল সময়ের মধ্যেও নৌবাহিনী তিন/চারটি জাহাজ প্রয়োজনীয় জনবলসহ গত ১৫ মার্চ থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও চাঁদপুরে জাটকা নিধন প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনায় কাজ করে যাচ্ছে।

করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ‘আমপান’। নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘূর্ণিঝড়পূর্ব প্রস্তুতি পরবর্তী উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয় সরিয়ে নিতে খলুনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট ইত্যাদি জেলায় অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তাসহ ব্যাপক প্রচরণা চালায়। ঘুণিঝড় পরবর্তী সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনীর ২৫টি যুদ্ধ জাহাজ, মেরিটাইম পেট্রোল এয়ার ক্র্যাফ্ট এবং হেলিকপ্টার দ্রুততম সময়ে জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় নিয়োজিত করা হয়। এরই আওতায়, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের গাবুরাসহ খুলনা, ভোলা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় জেলার দুর্গত এলাকাগুলোতে জাহাজ ও নৌ কন্টিনজেন্টের মাধ্যমে জরুরি ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় খাদ্য সামগ্রী, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, স্যালাইন ও অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

করোনা মহামারির মধ্যেও সমুদ্র হতে দীর্ঘদিন ভাসমান থাকা ৩০৬ জন বলপূর্বক বাস্তুচ্যূত মায়ানমার নাগরিকদের জীবিত উদ্ধার করে ভাসানচরে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে নৌবাহিনী মানবতার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভাসানচরে মায়ানমারের এই অভাবী মানুষদের জন্য নৌবাহিনী চিকিৎসা সুবিধাসহ ৩০ দিনের শুষ্ক রশদ, দৈনন্দিনের খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।

আরো খবর »