‘বাঙালি-রোহিঙ্গা’ সিন্ডিকেট, অর্থায়নে জনপ্রতিনিধি-নেতা-ডিলার

Feature Image

কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ইয়াবার রমরমা কারবার চলছে। গড়ে উঠেছে ‘বাঙালি-রোহিঙ্গা’ সিন্ডিকেট। উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয় শিবিরগুলোকে ইয়াবা কারবারের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে এই মাদক পাচারকারীচক্র। এতে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছে শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গারা। বিঘ্নিত হচ্ছে সুরক্ষাব্যবস্থাও। স্থানীয় বাসিন্দা, দায়িত্বরত একাধিক সংস্থার প্রতিনিধি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত তিন বছরে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা ইয়াবার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে গত ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ১০৪ জন রোহিঙ্গা (দুই নারীসহ) বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিকই ইয়াবা কারবারি। আবার ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি এবং কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।

সর্বশেষ গতকাল সোমবার ভোরে কক্সবাজারের খুরুশকূল মাঝির ঘাট থেকে ১৩ লাখ পিস ইয়াবার চালান জব্দ এবং এক রোহিঙ্গাসহ দুজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ‘বাঙালি বিল্লালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা আয়াজ দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসছিলেন।’

রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের কমিশনার মাহবুবুর আলম তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইয়াবার সিন্ডিকেট চেইনে রোহিঙ্গা ছাড়াও স্থানীয়, কক্সবাজারের বাইরের এবং বার্মিজ অনেকে জড়িত। ক্যাম্পে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ সব সংস্থা তল্লাশি করে। এর পরও কিছু লোক জড়িয়ে পড়ছে।’ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘নজরদারির মাধ্যমে গ্রেপ্তারসহ প্রিভেন্টিং কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রাগ ক্যারিং, অ্যান্টি ট্রাফিকিংয়ের ব্যাপারে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।’

কয়েকটি সূত্র জানায়, টেকনাফে ইয়াবা কারবারিদের দুই দফা আত্মসমর্পণ এবং সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারির পাশাপাশি র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে স্থানীয় পর্যায়ে ইয়াবা কারবার অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মাদক কারবারিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইয়াবা আসছে উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী, টেকনাফের উনচিপ্রাং সীমান্ত, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা বক্কর মেম্বরের বাড়ির পূর্ব পাশে, জালিয়া দ্বীপ, আমির হামজা ঘাট, জাদিমুড়া, পূর্ব রঙ্গিখালী আনোয়ার চেয়ারম্যানের প্রজেক্টের উত্তর-দক্ষিণ; উখিয়ার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী মৌলভীবাজার ব্রিজ, হারিঙ্গাঘোনা তুলাতুলী, ঝিমংখালী বিজিবি চেকপোস্ট এলাকা, নয়াবাজার পূর্ব সাতঘরিয়া পাড়া ও কানজরপাড়ার রুট-পয়েন্ট দিয়ে। আশ্রয়কেন্দ্রের পুরনো রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ইয়াবার বড় কারবারি। ‘বাঙালি-রোহিঙ্গা’ মিলে যৌথভাবে মাদকের কারবার চালাচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র মতে, উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোর কয়েক শ স্পটে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। এতে অর্থায়নসহ পৃষ্ঠপোষকতা করেন এক ডজনেরও বেশি জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও ডিলার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের তালিকায় পালংখালী ইউনিয়নেই ১৪০ জন ইয়াবা কারবারি আছে। উখিয়ার কুতুপালংয়ে ২ নম্বর ক্যাম্পের টিভি টাওয়ার এলাকার বাসিন্দা করিম (৩২) চালাচ্ছেন দুই শতাধিক বিক্রেতা নিয়ে একটি বড় সিন্ডিকেট। একাধিক হত্যাসহ কয়েকটি মামলার এই আসামি সহযোগী জিয়া মাঝিকে নিয়ে নৌকার মাঠ, পুরান ঢাল, টিভি টাওয়ার এবং ২, ৬ ও ৭ নম্বর ক্যাম্পে মাদকের কারবার চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইউপি সদস্য বখতিয়ার। পরে ইয়াবার চালানসহ কুতুপালংয়ের আরেক ইউপি সদস্য নূরুল আবছার চৌধুরী ও তাঁর সহযোগী নুরুল আলম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তদন্তকারীরা জানান, বখতিয়ার মেম্বারের সহযোগী ইয়াবা ডন আবছার মেম্বার। রোহিঙ্গা আবু তাহেরের ইয়াবা কারবারে বখতিয়ার ও আবছার মেম্বার কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। উখিয়ার আরো দুই ইউপি সদস্যের ইয়াবা কারবারে অর্থায়নের তথ্য পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই কারবারে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করছেন পলাতক হাকিম ডাকাত।

র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক ইয়াবার পৃষ্ঠপোষকতা করে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন। এমন তথ্য পেয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরো খবর »