‘হয়তো মেরেই ফেলেছে, নয়তো একটা ফোন দিত’

Feature Image

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ২০১০ সালের ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন নাজমুল হক মুরাদ। পিরোজপুরের কাউখালীর এই তরুণ ঠিকাদারের স্বজনরা তাঁর ফিরে আসার আশায় আজও দিন গুনছে। মুরাদের ভাই সিরাজুল হক লিপু বলেন, ‘একটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর মুরাদ মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিল। সেখান থেকেই তাকে গুম করা হয়। ঘটনার অন্তত ১০ দিন পর মোহাম্মদপুরের তুরাগ নদ থেকে একটি বিকৃত গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেটি মুরাদের বলে ধারণা করা হয়। তবে ডিএনএ পরীক্ষায় সেই লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। আমার ভাইকে হয়তো মেরেই ফেলেছে। বেঁচে থাকলে এত বছরে অন্তত একটা ফোন দিত…।’

মুরাদের স্বজনদের মতোই ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা নিয়ে হতাশায় ডুবে আছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, গত ১৪ বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৬০৪ জনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বেশির ভাগের জীবিত বা মৃত অবস্থায় সন্ধান মিললেও দুই শতাধিক ব্যক্তি আজও নিখোঁজ।

পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে স্বজনরা। প্রিয়জনের খোঁজ করতে গিয়ে তারা হয়রানি, ভয়ভীতিসহ নানামুখী অমানবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গুম-নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কমে এসেছে। তবে আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত করে রহস্য উন্মোচন না হওয়ায় আইনের শাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

এমন বাস্তবতায় আজ ৩০ আগস্ট সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম থেকে সবার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। গুমের শিকারদের স্মরণ ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ২০১১ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাত মাসে নিখোঁজ বা গুম হওয়ার ঘটনা কম। এই সময়কালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে দুজনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৯ সালে নিখোঁজ ১৩ জনের মধ্যে চারজন ফেরত আসে। একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৮ সালে নিখোঁজ ৩৪ জনের মধ্যে দুজন ফেরত এসেছে। ১৭ জনকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি ১৫ জনের হদিস নেই।

তবে গত ১৪ বছরের হিসাব যথেষ্টই উদ্বেগজনক। এ সময়ে ৬০৪ জনকে অপহরণের পর নিখোঁজ থাকার অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ৭৮ জনের লাশ পাওয়া যায়। ৬২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফিরে আসে ৫৭ জন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরে এবং বিভিন্নভাবে আরো কিছু ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে নিখোঁজদের হালনাগাদ খবর আসকের তথ্যে নেই।

আসকের হিসাব মতে, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ৩৪৪ জন নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে এদের ৪৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। গ্রেপ্তার দেখানো হয় ৬০ জনকে। আর ফিরে এসেছে ৩৫ জন। সে হিসাবে সাড়ে ছয় বছরে নিখোঁজ ছিল ২০৫ জন।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা ভয় আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় যাওয়ার পথে সাভারের নবীনগর থেকে নিখোঁজ হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহ ওয়ালীদ। ওয়ালীদের বড় ভাই সাইফুল্লাহ বলেন, ‘অনেকের সঙ্গে দেখা করেছি। ভাইয়ের সন্ধান চাইতে গিয়ে বিপদ দেখে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছি।’ মোকাদ্দাসের চাচাকে ফোনে হুমকি দেওয়া হতো। তিনি ভয়ে ঢাকার বাসা ছেড়ে পিরোজপুরে গ্রামের বাড়ি চলে যান।

যশোরের শংকরপুরের গাড়িচালক শাওন মির্জা ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল বন্ধু সাইদুর রহমান সাইদের সঙ্গে স্থানীয় পার্কে বেড়াতে যান। এরপর স্বজনরা খবর পায়, ওঁদের দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ। শাওনের বড় ভাই ফয়সাল বলেন, ‘থানা বা জেল কোথাও পাইলাম না। হয়তো বেঁচে নাই। বেেঁচ থাকলে তো পাইতাম…।’ ফয়সাল জানান, সাইদের মা পুলিশের বিরুদ্ধে একটি মামলা করলেও চাপে পড়ে তা প্রত্যাহার করে নেন।

আসকের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুম হোক আর হেফাজতে মৃত্যু হোক, বিচারবহির্ভূত প্রতিটি ঘটনারই প্রতিবাদ ও তদন্তের পর বিচার হওয়া দরকার। আমি মনে করি, একদিন গুম দিবস পালন নয়, প্রতিদিনই সবাইকে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। বিচার বিভাগকেও মনোযোগ দিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোও ফিরে পাওয়ার আশায় অনেক সময় কথা বলে না। তাদেরও আদালতে যাওয়া প্রয়োজন।’

হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইটির উপদেষ্টা ও আসকের সাবেক প্রধান নির্বাহী নূর খান লিটন বলেন, ‘গুমের শিকার পরিবারগুলো বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত। আমি মনে করি, স্বাধীন কমিশন গঠন করে ঘটনাগুলোর তদন্ত করা দরকার। সেখানে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারবে।’

আরো খবর »