করোনায় আক্রান্তে শীর্ষে স্বাস্থ্যকর্মীরা

Feature Image

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হারে পেশাজীবীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। এরপর রয়েছে পুলিশ, অন্যান্য চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, গৃহিণী ও শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের পেশাজীবীরা করোনা আক্রান্তে নিচের দিকে রয়েছেন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) পুরো দেশের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পেয়েছে। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে পুলিশের হিসাব অনুসারে করোনায় সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বাহিনীর সদস্যরা।

ড. ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পুরো দেশ থেকে যে তথ্য আসে সেগুলোর বিভিন্ন সূচক ধরে বিশ্লেষণ করি। আক্রান্তদের মধ্যে পেশাগত বিভাজন করে খুঁজে দেখারও চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে এককভাবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। শুরুতে আক্রান্তের এই হার অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে কিছুটা কমে এসেছে। তার পরও এখনো স্বাস্থ্যকর্মীরাই বেশি আক্রান্ত।’

আইইডিসিআরের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যেহেতু নতুন দায়িত্ব নিয়েছি, তাই এ ধরনের গবেষণা ও বিশ্লেষণের বিষয়টি ভালো করে না জেনে বলতে পারছি না।’

অন্যদিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার কয়েকটি নন-কভিড হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সর্বাধিক আক্রান্ত হচ্ছেন নার্সরা।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুসারে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পেশাজীবীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য), ১৯.২ শতাংশ সরকারি-বেসরকারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, ১৬.৩ শতাংশ গৃহিণী, ১০.৯ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ১০.৭ শতাংশ ব্যবসায়ী, ৯.১ শতাংশ শিক্ষার্থী, ৩.২ শতাংশ অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, ১.৫ শতাংশ গার্মেন্টকর্মী, ১.৩ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবী, ০.৭ শতাংশ সংবাদকর্মী এবং ৫.৫ শতাংশ অন্যান্য পেশাজীবী রয়েছেন।

এসব তথ্যের বিষয়ে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যা পরীক্ষা হচ্ছে বা আইইডিসিআরে তথ্য আসছে তার ভিত্তিতেই এ হিসাব। কমিউনিটি পর্যায়ে যেহেতু এখনো ব্যাপক পরীক্ষা হচ্ছে না, ফলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বাধিক আক্রান্ত কি না, তা আরো বড় পরিসরে জরিপ করে দেখলে ভালো হতো। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা যেহেতু জানা-অজানা সংক্রমিতদের সংস্পর্শে বেশি থাকছেন, তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সম্প্রতি দেশের কয়েকটি নন-কভিড হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের (চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সেবাকর্মী) ওপর করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা জরিপ চালায়। অধ্যাপক ডা. ফজিলা তুন নেসা মালিকের নেতৃত্বে গবেষণা জরিপের ফলাফল স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ‘কিউরিয়াস জার্নাল অব মেডিক্যাল সায়েন্স’-এ গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত হয়। ওই ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত গবেষণা জরিপটি চালানো হয়। এতে অংশ নেওয়া এক হাজার ৪০৯ জন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ১৩৯ জন (৯.৮৬ শতাংশ) করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, যাঁদের বয়স ২০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। এঁদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ নারী, অন্যরা পুরুষ। আবার আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চিকিৎসক ও নার্সের চেয়ে অন্য সেবাকর্মীরা বেশি। এর মধ্যে চিকিৎসক ১৮ শতাংশ, নার্স ৪০.৩ শতাংশ, অন্য সেবাকর্মী ৪১.৭ শতাংশ।

আক্রান্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৪.২ শতাংশের জ্বর হয়। ৭.২ শতাংশ ছিল উপসর্গহীন। আক্রান্তদের প্রায় সবাই আইভারমেকটিন, ডক্সিক্যাপ ও অ্যাজিথ্রমাইসিন সেবন করেছেন। ৫৯ শতাংশ বাসায়, ২৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে ছিলেন। এই ১৩৯ জনের মধ্যে ২০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। মারা গেছেন একজন। অন্যরা সবাই সুস্থ হয়েছেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও দেশজুড়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ-সংরক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের মহামারির সময় অন্য পেশাজীবীর চেয়ে চিকিৎসাকর্মীরা বেশি আক্রান্ত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। এ পর্যন্ত দেশে করোনায় দুই হাজার ৬৮৮ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৯৩১ জন নার্স, তিন হাজার ১৬৬ জন অন্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮২ জন চিকিৎসক, ১১ জন নার্স এবং সাতজন অন্য চিকিৎসাকর্মী মারা গেছেন। পেশাজীবীদের মধ্যে এককভাবে মৃত্যুর সংখ্যায় চিকিৎসক বেশি।’

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ বিভাগের ১৬ হাজার ৬৫২ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন আর মারা গেছেন ৭২ জন।’

তাঁর দেওয়া হিসাব মতে স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পুলিশ সদস্য। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা হারে চতুর্থ অবস্থানে (১০.৯ শতাংশ) রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্তের হার ২১.৭ শতাংশ।

আরো খবর »