পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ছুটির অপব্যবহার

Feature Image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার শারমিন জাহান। ২০১৬ সাল থেকে চীনের উহানে পিএইচডি গবেষণার জন্য শিক্ষা ছুটিতে আছেন। বিধি অনুযায়ী, শিক্ষা ছুটিতে থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কিছু করতে পারবেন না। অথচ শারমিন জাহান ‘অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে দিব্যি অবৈধ বাণিজ্য করে যাচ্ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে তিনি।

এভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক বর্তমানে শিক্ষা ছুটিতে আছেন। এসব শিক্ষকের বেশির ভাগ পাঁচ বছর শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করলেও দেশে আর ফেরেন না। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে নানা ধরনের বৈধ-অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ আবার বিভিন্ন এনজিও ও বেসরকারি সংস্থার পরামর্শক, মালিক হয়ে দিব্যি কাজ করছেন। ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের পাশাপাশি ছুটিতে না থেকেও অনেক শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দিব্যি চাকরি করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৪০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। সেখানে মোট শিক্ষক ১৪ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে কর্মরত ছিলেন ১১ হাজার ১২৩ জন। শিক্ষা ছুটিতে দুই হাজার ১৪৪ জন, প্রেষণ বা লিয়েনে ৭০ জন, বিনা বেতনে ছুটিতে ৭০ জন, অননুমোদিত ছুটিতে ২৫ জন, খণ্ডকালীন, চুক্তিভিত্তিক এবং অন্যান্য ছুটিতে রয়েছেন এক হাজার ৯৭ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই হাজার ১৮৮ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্তব্যরত আছেন এক হাজার ৬৫৭ জন। বাকি ৫৩১ জনই বিভিন্ন পর্যায়ের ছুটিতে রয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ২১০ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০০ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৪৮ জন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ৭১৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ২৭৭ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৩১১ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৯৬ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৫২ জন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৫২ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৩৩ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৫৭ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৪৮ জন শিক্ষক কর্তব্যে অনুপস্থিত রয়েছেন। অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পাঁচ বছর পর্যন্ত পূর্ণ বেতনে শিক্ষা ছুটি পান। পরবর্তী এক বছর অর্ধেক বেতন। এ ছাড়া বিনা বেতনে কাটাতে পারেন আরো এক বছর। তবে দেশে ফিরে শিক্ষা ছুটির সমপরিমাণ সময় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার শর্তে শিক্ষকদের ছুটি মেলে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফার্মাসি বিভাগের সাবেক শিক্ষক শামীম হোসেন। শিক্ষা ছুটিতে জাপান যাওয়ার পর তিনি আর কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেননি। এ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রায় ৮০ জন শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি।

শিক্ষা ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সিন্ডিকেট সভায় ৫২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসেননি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ জন শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগপ্রক্রিয়া যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। বিশেষ করে তদবির, আত্মীয়করণ এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পর অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ফুলে-ফেঁপে ওঠেন। শিক্ষকতার মতো মহান পেশার অপব্যবহার করে অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান। আবার অনেকে অন্য চাকরি বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষা ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক শিক্ষক প্রভাব বিস্তার করেন। শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত শিক্ষা ছুটির অপব্যবহার করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনেকটাই চুপ।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকে নিজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে তাঁরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় ব্যবহার করে নানাভাবে তাঁরা অর্থ উপার্জন করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন শিক্ষকের ছুটি মঞ্জুরের আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি দেখা হয়। আর যাঁরা শিক্ষা ছুটিতে গিয়ে ফিরে না আসেন, তাঁদের ব্যাপারটি আমাদের সিন্ডিকেট কঠিনভাবে দেখে।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মনে করি, শিক্ষকতার বাইরে একজন শিক্ষকের অন্য যেকোনো কাজের জন্য অনুমতি নেওয়া নৈতিকতা পরিপন্থী। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে থাকতে পারবেন। সেই ছুটি পাঁচ বছরের বেশি হতে পারবে না। শিক্ষকরা লাভজনক কোনো কাজে জড়িত থাকতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ঠিকই আছে, কিন্তু প্রয়োগের দুর্বলতা রয়েছে।’

ইউজিসির এই সদস্য আরো বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমস্যা রয়েছে। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক হতে হলে পিএইচডি লাগে। ফলে তাঁদের তেমন কোনো শিক্ষা ছুটির প্রয়োজন হয় না, কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষক হওয়ার জন্য স্নাতকোত্তর হলেই চলে। এ কারণে পিএইচডির জন্য সুযোগ দিতেই হয়। কেউ কেউ এই সুযোগের অপব্যবহার করছেন।’

আরো খবর »