রহস্য ভেদে ১৭ বিষয় যাচাই

Feature Image

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামে মসজিদটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ উদ্ঘাটনে ১৭টি বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। গতকাল রবিবারও দিনভর মসজিদের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন আলামত পর্যবেক্ষণ করেছেন ফায়ার সার্ভিসসহ চারটি সংস্থার তদন্ত কমিটি। মসজিদ ভবনের নিচ দিয়ে গ্যাসলাইন যায়নি বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও মসজিদসহ আশপাশের রাস্তার নিচে গ্যাসের অনেক লিকেজ পাওয়া গেছে। মসজিদ ভবনটি নির্মাণ এবং গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে দুই কর্তৃপক্ষেরই কোনো গাফিলতি আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বৈদ্যুতিক গোলযোগে (শর্ট সার্কিট) আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হলেও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বড় কোনো ক্ষতি না হওয়ায় আগুনের অন্য উৎসও যাচাই চলছে। তবে মসজিদের ভেতরে খোলা অবস্থায় অনিরাপদ ছিল বৈদ্যুতিক বোর্ডটি। গ্যাস জমে থাকা ঘরে যেকোনো ছোট উৎসর আগুনেও বিস্ফোরণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, মিথেন গ্যাস মসজিদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) কক্ষের ভেতরে একটি গ্যাসে চেম্বারের মতো হয়েছিল। এ কারণে সব স্থানে একই রকম ক্ষতি হয়েছে। মুসল্লিদের শ্বাসনালি পোড়াসহ একই রকমের ক্ষতি হয়েছে। এই গ্যাস কিভাবে বিস্ফোরক হয়ে ওঠে, সেটিই এখন তদন্তের প্রধান বিষয়।

ইলেকট্রনিক সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইসাব) সহসভাপতি মো. মঞ্জুর আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কালের কণ্ঠকে বলেন, মসজিদে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার মূল কারণ হচ্ছে নির্গত গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি, যেখানে মিথেন গ্যাসের আধিক্য ছিল। গ্যাস জমতে জমতে মসজিদটি একসময় বিশাল গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

সেটা ভিড়ের কারণে হোক বা অন্য কারণে হোক, আঁচ করতে পারেননি মুসল্লিরা। এই গ্যাস শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মুসল্লিদের নাকে-মুখে পেটে প্রবেশ করেছিল। বৈদ্যুতিক লাইন পরিবর্তন করতে গিয়ে ন্যানো সেকেন্ডেরও কম সময়ে স্পার্ক (আগুনের ফুলকি) হলে পুরো ঘরে বস্ফািরিত হয়ে আগুন লেগে যায় বলেই মনে হচ্ছে। আগুন সব মুসল্লিকেই প্রায় সমানভাবে দগ্ধ করে এবং প্রত্যেকেরই ইনহেলিশন বার্ন (শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়া) হয়।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তরের উপপরিচালক মো. নূর হাসান, ‘এসির বিস্ফোরণে মসজিদের ভেতরে আগুন লাগেনি। জমে যাওয়া গ্যাস থেকেই মসজিদের ভেতরে আগুন লেগেছে। আর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় যখন মুয়াজ্জিন ম্যানুয়ালি লাইন পরিবর্তন করেছেন তখনই চোখের পলকে স্পার্ক হয়েছে। ওই সময়ই আগুন পুরো মসজিদে লেগে যায়। তিনি বলেন, তার পরও আমরা আগুন লাগার পেছনে কোনো ধরনের নাশকতা আছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখছি। মসজিদের ভেতরে এভাবে বৈদ্যুতিক বোর্ড লাগানো ঠিক হয়নি। আবার সেই বোর্ড খোলা রাখাও নিরাপদ ছিল না।’

ডিপিডিসির তদন্তকারী সূত্র জানায়, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে সুইচবোর্ড, সংযোগসহ অনেক কিছুই সামান্য পুড়েছে। এতে সন্দেহ হচ্ছে, দ্বিতীয় কোনো সূত্র থেকে প্রথম আগুন এসেছে কি না। পুরো বিদ্যুতের সংযোগ পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সোর্স যুক্ত হলে এসির কম্প্রেসর এবং ফ্যানগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বেশি মাত্রায় গ্যাস, অল্প আগুনের ছোঁয়াও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

সূত্র মতে, আগুনের সূত্র নিশ্চিত হতে তদন্ত কমিটিগুলো ১৭টি বিষয় খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে প্রথমত দেখা হচ্ছে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগেছে কি না। দ্বিতীয় মসজিদ ভবনের কোথাও রান্নাঘর আছে কি না। ভবনে শিশুরা খেলা করতে গিয়ে বা অন্য কোনোভাবে আগুন জ্বালিয়েছে কি না। নাশকতা ঘটনার মতো কোনো আলামত আছে কি না। গ্যাসলাইনের সংস্পর্শে আগুন এসেছে কি না। গ্যাসের লাইনগুলো কোন কোন দিকে গেছে এবং সম্ভাব্য লিকেজ কোথায়?—এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে কমিটি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাস ও মসজিদ কমিটির দায়দায়িত্ব দেখছে জেলা প্রশাসনের কমিটি।

গত শুক্রবার রাতে বিস্ফোরণের পর ফতুল্লার গোটা তল্লা এলাকার গ্যাসের লাইন বিচ্ছিন্ন আছে। স্থানীয় লোকজন বলছে, কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই লাইন বন্ধ রাখা হয়েছে। এলাকায় অনিরাপদ লাইন থাকলেও কর্তৃপক্ষ এত দিন গুরুত্ব দেয়নি। এখন পুরো বিষয়টি ধরা পড়ার কারণে লাইন বন্ধ রাখা হয়েছে। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুন শনিবার বলেন, দুর্ঘটনার পর এলাকার দুটি বাল্ব (সংযোগ) বন্ধ রাখা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে জাফরুল্লাহ চৌধুরী
এদিকে গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, সুশাসন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়টি সঠিকভাবে দেখভাল করতে হবে। তিনি বিস্ফোরণে আহত ও নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি করেন।

বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেন, মনে হয়েছে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী যে সেফটি রেগুলেশন কোড থাকা দরকার, সেটি এখানে নেই। এখানে বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস বিভাগ ও স্থানীয়দের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। মসজিদের সামনের সড়কে সব সময় পানি জমে থাকে। ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশনের মাঝামাঝি পড়ায় কেউই এখানে দায় নিতে চায় না।

আরো খবর »