কুষ্টিয়ায় মণ্ডপে মন্ডপে প্রতিমা তৈরীতে ব্যস্ত মৃৎ শিল্পীরা

Feature Image

পুলক সরকারঃ হিন্দু সম্প্রদায়ের বারো মাসে তেরো পার্বণ এ কথাই প্রচলিত আমাদের সমাজে। মাঠে ঘাটে কাশফুল। শরতের নীল আকাশ। স্নিগ্ধ সকাল। পাড়ায়, গ্রামে ও মহল্লায় পূজার প্যান্ডেল। নতুন পোশাক। আত্মার আত্মিয়দের নিমন্ত্রন। আত্মিয়- বন্ধুর বাড়ি এবং মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা দর্শনের মজাই আলাদা। এইতো আর মাত্র কয়েক দিন। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দূর্গা পুজা।

পুরান অনুযায়ী দূর্গা শব্দের অর্থ অ- প্রতিরোধ্য। অর্থাৎ তাকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। এবারে এই মহামায়া দশভুজা দেবী দূর্গার আগমন ঘোটকে গমন দোলায় চড়ে। পন্ডিতেরা বলেছেন, দেবীর ঘোড়ায় চড়ে আগমন খুব একটা শুভ নয়। শাস্ত্র মতে মহাময়া দূর্গা দেবীর ঘোড়ায় চড়ে আগমন দুর্যোগ আসার সম্ভাবনা থাকে।

যখন ধর্ম ও অধর্ম’ র মধ্যে সংকট সৃষ্টি হয় তখনই এই পরমা প্রকৃতি দেবী দূর্গা রূপ ধারণ করে অধর্মের নাশ ও ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। পুরা কালে দুর্গম নামের এক অশুরকে পরাস্ত করেন এই মহামায়া দূর্গা। তাই মহাদেব তার নামকরণ করেন দেবী দুর্গা। একের পর এক যখন মহিষী মাতার পুত্র অশুর মহিষাসুর স্বর্গ, মত্য- পাতালে অন্যায় অত্যাচারে ভরে তোলে। তখন এই মহিষাসুর কে পরাজিত করার লক্ষ্যে, দেবতাগণ ও ত্রিদেব- দেবীর যে শক্তি রূপের সৃষ্টি করেন তিনিই দশভূজা দেবী দূর্গা।

মহালয়া আসা থেকেই ধুম শুরু হয় দূর্গা উৎসবের। এবারে মহালয়া ৬ অক্টোবর (১৯ আশ্বিন) বুধবার, ১০ অক্টোবর (২৩ আশ্বিন) রবিবার মহাপঞ্চমী, ১১ অক্টোবর(২৪ আশ্বিন) সোমবার মহাষষ্ঠী, ১২ অক্টোবর(২৫ আশ্বিন) মঙ্গলবার মহাসপ্তমী, ১৩ অক্টোবর (২৬ আশ্বিন) বুধবার মহাঅষ্টমী, ১৫ অক্টোবর( ২৭ শে আশ্বিন) বৃহস্পতিবার মহানবমী এবং ১৬ অক্টোবর(২৮ শে আশ্বিন) শুক্রবার বিজয়া দশমী। এই বিজয়া দশমীর মধ্যে দিয়েই শেষ হবে দূর্গা উৎসব।

সরেজমিন ঘুরে প্রতিমা শিল্পীদের ব্যস্ততার চিত্র দেখা গেছে। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। ব্যস্ত প্রতিমা শিল্পীরা। গভীর রাত পর্যন্ত চলেছে প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে একেকটি প্রতিমা। অতি ভালোবাসায় তৈরি করা হচ্ছে দুর্গা, সরস্বতী, কার্তিক, লক্ষ্মী, গণেশ, অসুর ও শিবের মূর্তি। ইতোমধ্যে প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে দেবীর মূর্তি নির্মাণের অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

কথা হয় পৌর এলাকার কমলাপুরের প্রতিমাশিল্পী শ্রী সুকুমার ভাস্কর (৫৫) এর সাথে। তিনি খোকসা কেন্দ্রীয় দূর্গা মন্দিরে প্রতিমা তৈরির করছে। তিনি বলেন, এ বছর ১৫ টি প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। একটা প্রতিমা তৈরির জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে থাকি। আমরা চার জন একসঙ্গে কাজ করছি। একটি দূর্গা প্রতিমা তৈরি করতে সময় লাগে কমপক্ষে ১০ দিন। তবে একবারে একটি প্রতিমা তৈরি করা যায় না। কারণ কাদামাটি না শুকালে রঙ এর কাজ কারা যায় না।

তিনি আরো বলেন, প্রতিমা তৈরিতে এঁটেল ও বেলে মাটি ছাড়াও বাঁশ-খড়, ধানের কুঁড়া, দড়ি, লোহা, পাট, কাঠ, রঙ, বিভিন্ন রঙের সিট ও শাড়ি-কাপড়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে মূর্তি তৈরির প্রাথমিক কাজ চলছে। এরপর রঙের কাজ করা হবে। সবকাজ শেষ হলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মণ্ডপের প্রতিমা বসানো হবে।

আরেক প্রতিমাশিল্পী নিমাই বিশ্বাস বলেন, সারা বছর এই সময়টির জন্য অপেক্ষায় থাকি। বছরের অন্য সময় তেমন কাজ না। এই সময় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে অনুপাতে প্রতিমা তৈরির মজুরি আনুপাতিক হারে বাড়েনি।

জানিপুর ইউনিয়নের ইচলাট সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক কাজল ঘোষ বলেন, দুর্গাদেবীকে বরণ করে নিতে আমাদের মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। তিনি আরো বলেন, গত বারের চেয়ে এ বছর প্রতিমা তৈরির খরচ বেশি হচ্ছে।

কথা হয় খোকসা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুধাংশু কুমার বিশ্বাস মাধবের সাথে। তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শারদীয় দুর্গা পূজা। প্রতি বছরের মতো এবারও এ উৎসবটি জাকজমকভাবে উদযাপন করা হবে। তিনি আরো বলেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে উৎসবের পরিধি ছোট করতে হবে।

কুষ্টিয়া জেলায় কয়টি পূজা মন্দিরে দুর্গাপূজা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়া জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারন সম্পাদক এ্যাডভোকেট জয়দেব কুমার বিশ্বাস জানান, কুষ্টিয়া জেলায় ২৪১ টি মন্ডপে দূর্গা পুজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় জেলাতে এবারে ১০টি বেশি পূজা মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

খোকসা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ মামুনুর রশিদ বলেন, দেবী বিসর্জন পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী টিমসহ প্রশাসনিক নজরদারি সার্বক্ষণিক থাকবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য টহল পুলিশ এবং পূজামণ্ডপ গুলোর জন্য মোবাইল টিম থাকবে। সার্বক্ষণিক টহল পুলিশ ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।

আরো খবর »