‘পুলিশ জিগাইলে বইলেন মিটারে যাইতাসেন’

Feature Image

ঢাকা: ‘মামা পুলিশ জিগাইলে বইলেন মিটারে যাইতাসেন।’ রাজধানীতে যারা নিয়মিত সিএনজি-অটোরিকশায় চড়েন, তাদের কাছে পরিচিত কথা এটি। সিএনজি চালকদের এমন আবদার অনেকটা বাধ্য হয়েই রাখতে হচ্ছে অনেক যাত্রীকে। কারণ এ শর্তেই তারা সিএনজিতে চড়েন। ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পুরনো। নতুন করে বিআরটিএ সূত্রে জানা গেলো, রাজধানীতে ১৩ হাজার বৈধ সিএনজি-অটোরিকশার পাশাপাশি চলছে অবৈধ ৩০ হাজার। মোটকথা, মনিটরিং না থাকায় রাজধানীজুড়ে নৈরাজ্য চলছে সিএনজি-অটোরিকশার চালকদের।

বিআরটিএ বলছে, সিএনজি-অটোরিকশায় তাদের বিশেষ নজরদারি নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালত মিটারে চলাচলের বিষয়টি দেখে মাঝে মাঝে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব রয়েছে সিএনজির ক্ষেত্রে। কোনও চালকই মিটারে যায় না। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, মিটারে চলাচলের বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন।

উত্তরার সিএনজি চালক আব্দুর রউফ বলেন, জমা ১১শ’ টাকা। মিটারে গেলে পেটই ভরবে না। তাকে গন্তব্যের বিষয়ে জানালে চান অস্বাভাবিক ভাড়া।

রাজধানীর প্রায় শতভাগ সিএনজিচালকেরই একই অজুহাত—জমা বেশি। সিএনজি চালক সাইদুরকে মিরপুর-১ থেকে গুলশানের কথা বলতেই তিনি বলেন, ভাড়া ৪০০ লাগবে। মিটারে যাবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন কি আর কেউ মিটারে যায়! এই বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কথা হয় সিএনজি চালক শফিকের সঙ্গে। তার গাড়িতে লেখা প্রাইভেট। মিটারও নেই। মোহাম্মদপুর যেতে চাইলে জানান ভাড়া লাগবে ৩৫০ টাকা। শফিক আরও বলেন, ছাইরঙা সিএনজিগুলোর বেশিরভাগই সার্জেন্ট ও পুলিশ সদস্যদের নামে চলে। কোথাও ধরলে সার্জেন্টকে ফোনে ধরিয়ে দিই। তবে আমরা সব জায়গায় যাই না। মোহাম্মদপুর-উত্তরা-কাওরান বাজার-নিউমার্কেট-গুলশান পর্যন্ত আমাদের এরিয়া।

বেসরকারি কলেজের শিক্ষক সুমন উত্তরা থেকে গিয়েছিলেন মোহাম্মদপুর। ৪ নম্বর সেক্টরে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় ঘণ্টাখানেক। শেষে একজন যেতে রাজি হন। ভাড়া ৪৫০ টাকা। সুমন বলেন, ‘আমরা তো যাত্রী। আমাদের নিয়ে কেউ ভাবে না। চালকরা যেভাবে ইচ্ছা দাম চায়।’

রাকিবুল বলেন, ‘সিএনজি মিটারে চলছে নাকি চুক্তিতে, বিষয়টি দেখার জন্য কখনও দায়িত্বশীল কাউকে রাস্তায় দেখিনি। পুলিশও এখন আর যাত্রীদের কাছে জানতে চায় না—চুক্তিতে না মিটারে যাচ্ছে। আবার কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ সিএনজি, সেটা তো যাত্রীরা বুঝবে না।’

সিএনজি চলাচলে কী ধরনের মনিটরিং রয়েছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ’র পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, মোবাইল কোর্ট চালানোই আমাদের মনিটরিং।

পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে তিনি বলেন, ‘মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পুলিশের। মোবাইল কোর্টে অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। অসঙ্গতি পেলে মামলা দিচ্ছে।’

কয়েক বছর আগে শুধু সিএনজিকে টার্গেট করে বেশ কিছু অভিযান চালানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আমাদের টার্গেট গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা। যে কারণে সিএনজির প্রতি নজরদারিতে ঘাটতি পড়েছে কিছুটা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানীর বাসগুলোর মতো সিএনজি-অটোরিকশাও খেয়াল-খুশিমতো চলছে। কোনও বিষয়ে গণমাধ্যম সরব হলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছুটা তোড়জোর দেখায়।

সিএনজি-অটোরিকশার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা এবং পরের প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা।

রাজধানীতে অবৈধ সিএনজি-অটোরিকশা পুলিশের সামনেই চলে উল্লেখ করে মোজাম্মেল হক বলেন, অবৈধগুলোর বেশিরভাগই সার্জেন্ট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে চলে। পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তিও হয় এগুলোর। এখন তো বৈধ সিএনজির চেয়ে অবৈধই বেশি।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, কোনও সিএনজিচালিত অটোরিকশা পুলিশ কর্মকর্তার বা কোনও সদস্যের নামে চলার সুযোগ নেই। তবে কেউ চালাচ্ছেন কিনা তা আমাদের নলেজে নেই। আমরা চেক করি সিএনজি-অটোরিকশার লাইসেন্স আছে কিনা, তারা ট্রাফিক আইন মানছে কিনা এসব।

আরো খবর »